Wednesday, 6 August 2025

মুসলিমদের বেহেশতে ৭০ বা ৭২ জন কুমারী (হুর) পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা নাকি তাদের সকল নেক আমলের প্রধান উদ্দেশ্য – রোজা, হজ, যাকাত, নামাজ – সবকিছুর পেছনে নাকি এই একটাই কামনা। এমনকি সন্ত্রাসবাদকেও এর লোভের সাথে জুড়ে দিয়ে অনেক সময় মজাক করা হয়। প্রশ্ন হলো, এই ধারণার পেছনের সত্য কী? সত্যিই কি এমন ৭২ জন হুর পাওয়ার কথা কুরআন বা হাদিসে বলা হয়েছে? এই "বাস্তুর হুর" বা "৭০/৭২ হুর" এর উল্লেখ কি কুরআনে কোথাও সরাসরি পাওয়া যায়?

উত্তর:-- যখন এই "হুরদের" কথা বলা হয়, তখন অনেকে বলেন যে, তাদের মনোযোগ কেবলই ৭২ জন কুমারীর দিকে, অন্য কিছুর দিকে নয়। আসুন, এই বিষয়ে ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা কী, বিস্তারিত আলোচনা করি। পুরস্কারের নীতি: একটি প্রাকৃতিক প্রেরণা প্রথমেই বুঝতে হবে, ইসলামে পুরস্কার বা নেয়ামতের উল্লেখ কেন করা হয়েছে? আল্লাহ তা'আলা মানুষকে এই দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন এবং তাদের ভালো কাজ করার জন্য উৎসাহিত করেছেন। এরপর জানিয়েছেন যে, যদি তোমরা ভালো কাজ করো, তাহলে জান্নাতে গিয়ে তোমরা বিশেষ নেয়ামত লাভ করবে। এই নেয়ামতের উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো মানুষকে প্রেরণা দেওয়া, যাতে তারা ভালো কাজের প্রতি উৎসাহিত হয়। এটা একটি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ব্যাপার। যেমন, ছাত্রছাত্রীরা ভালো রেজাল্ট বা ডিগ্রি পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করে, ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার জন্য পরিশ্রম করে। তারা জানে যে পরিশ্রম করলে তাদের ভবিষ্যৎ ভালো হবে। যদি তাদের বলা হতো যে পরিশ্রম করে লাভ নেই, সবাই পকোড়া বানাবে – তবে তাদের প্রেরণা নষ্ট হয়ে যেত। তাই আল্লাহ মানুষকে উৎসাহিত করার জন্য নেয়ামতের কথা বলেছেন, যাতে তারা নেক আমলের প্রতি আগ্রহী হয়। এটা একটি প্রাকৃতিক প্রেরণা, যা শুধু ধর্মের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। আল্লাহ কাউকে নিরুৎসাহিত করেন না; বরং তিনি মানুষকে তাঁর অনুগ্রহের দিকে আহ্বান করেন। ইসলামী নীতি: পুরুষ ও নারীর জন্য নেয়ামতের সমতা ইসলামে কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে যা এই বিষয়টি বুঝতে সাহায্য করবে: ১. নেয়ামতের মানের দিক দিয়ে সমতা: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতে পুরুষ বা নারী যাকেই পুরস্কার (নেয়ামত) দেবেন, নেয়ামতের মানের দিক দিয়ে তাতে কোনো পার্থক্য থাকবে না। নামাজ, যাকাত সবকিছু যেমন নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য, তেমনি জান্নাতে পুরস্কারও উভয়ের জন্য। ২. জান্নাতে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে সমতা: জান্নাতে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রে পুরুষ ও নারীর মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। পুরুষ জান্নাত অর্জন করলে নারীও করতে পারবে। জান্নাতে পুরুষের জন্য যা থাকবে (যেমন প্রাসাদ), নারীর জন্যেও তাই থাকবে। ৩. কিছু নেয়ামত গোপন রাখা হয়েছে: আল্লাহ তা'আলা জান্নাতবাসীদের জন্য যত নেয়ামত রেখেছেন, তার সবকিছু কুরআনে বিস্তারিত উল্লেখ করেননি। কিছু নেয়ামত এমন যা মানুষ কল্পনাও করতে পারে না, সেগুলো মানুষকে চমকে দেওয়ার জন্য গোপন রাখা হয়েছে। ৪. "যা চাইবে তাই পাবে" নীতি: জান্নাতের একটি মৌলিক নীতি হলো, যারা জান্নাত লাভ করবে, তারা যা চাইবে তাই পাবে। "৭২ হুর" প্রসঙ্গ: ভুল ব্যাখ্যা ও প্রকৃত অর্থ "৭২ জন কুমারী" বা "শুধুমাত্র কুমারীত্বের উপর দৃষ্টি নিবদ্ধ করা", এটি কুরআনের মূল বার্তা নয়, বরং একটি ব্যাখ্যা যা মানুষের পক্ষ থেকে এসেছে। কুরআনে সরাসরি এই নির্দিষ্ট সংখ্যার উল্লেখ নেই। তবে হাদিসে শহীদের জন্য ৭২ জন স্ত্রীর কথা উল্লেখ আছে , কিন্তু মূল কুরআনিক ধারণা এবং সাধারণ আলোচনা এই সংখ্যার উপর ভিত্তি করে হয় না। কুরআনে জান্নাতবাসীদের জন্য "পাকবাজ" (Pakbaz) অর্থাৎ পবিত্র, নিষ্কলুষ, লজ্জাবতী স্ত্রীর উল্লেখ রয়েছে। এই "পাকবাজ" শব্দটিই মূল বিষয়, সংখ্যা বা শুধুমাত্র কুমারীত্ব নয়। লিঙ্গ ন্যায় বনাম লিঙ্গ সমতা এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ইসলাম লিঙ্গ সমতায় (Gender Equality) নয়, বরং লিঙ্গ ন্যায়ে (Gender Justice) বিশ্বাস করে। কিছু লোক প্রশ্ন তোলে যে একজন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী (হুর) থাকলে নারীর জন্য একাধিক স্বামী কেন নয়। এই প্রশ্নটি লিঙ্গ সমতার ত্রুটিপূর্ণ ধারণার উপর ভিত্তি করে করা হয়, যার কোনো ভিত্তি ইসলামে নেই। প্রকৃতিগতভাবেই নারী-পুরুষ ভিন্ন। যেমন, পুরুষ গর্ভবতী হয় না, নারী হয়। প্রকৃতির এই ভিন্নতাকে অস্বীকার করে সবকিছুতে সমানাধিকার চাওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। বরং ইসলামে সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হয়। জান্নাতে একাধিক স্ত্রী: লিঙ্গ ন্যায়ের দৃষ্টিকোণ ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে, পুরুষ দুনিয়াতে চারটি পর্যন্ত স্ত্রী রাখতে পারে। জান্নাতে এর চেয়ে বেশি থাকলে তা কীভাবে ন্যায়ের অন্তর্ভুক্ত হয়? এর উত্তরটি জান্নাতের প্রকৃতির সাথে জড়িত। আল্লাহ তা'আলা বলেছেন যে জান্নাতে মানুষের অন্তর থেকে সমস্ত বিদ্বেষ, হিংসা ও অসুস্থতা দূর করে দেওয়া হবে। দুনিয়াতে একাধিক স্ত্রী থাকলে তাদের মধ্যে ঈর্ষা, প্রতিযোগিতা এবং স্বামীর অধিকার আদায়ে সমস্যা হতে পারে – এগুলো আত্মার অসুস্থতা। কিন্তু জান্নাতে যখন ঈর্ষা, বিদ্বেষ বা কোনো আধ্যাত্মিক অসুস্থতা থাকবে না, তখন একাধিক স্ত্রী থাকলেও তাদের মধ্যে কোনো সংঘাত বা অন্যায়ের প্রশ্ন উঠবে না। বরং তাদের মধ্যে ভালোবাসা ও মিল থাকবে। তাই, জান্নাতের এই পবিত্র পরিবেশে একাধিক স্ত্রী থাকা লিঙ্গ ন্যায়ের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। নারীর জন্য নেয়ামত: পবিত্রতা ও মর্যাদা তাহলে নারীর জন্য জান্নাতে কী আছে? নারীর জন্য প্যাকেজ হলো "পবিত্রতা" (Purity) এবং "যত্ন" (Care)। কুরআনে জান্নাতে যে স্ত্রীদের উল্লেখ করা হয়েছে, তাদের পবিত্রতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই পবিত্রতা মানে কেবল কুমারীত্ব নয়, বরং আত্মিক পবিত্রতা, নিষ্কলুষতা এবং পার্থিব অপবিত্রতা থেকে মুক্তি। ঠিক যেমন রামের জন্য সীতার পবিত্রতা (পাক দামন) গুরুত্বপূর্ণ ছিল, যা প্রমাণ করার জন্য অগ্নিপরীক্ষার কথা আসে। তেমনি জান্নাতে মুমিন নারীর পবিত্রতা তার জন্য এক বড় নেয়ামত।

Labels: